0.00৳
রুকইয়াহ শরইয়াহ কী?
রুকইয়াহ শরইয়াহ হলো কুরআনের আয়াত, আল্লাহর সুন্দর নাম ও গুণাবলি (আসমা-উল-হুসনা) এবং রাসূল ﷺ শেখানো সহীহ দোয়ার মাধ্যমে রোগ-ব্যাধি, আধ্যাত্মিক সমস্যা ও মানসিক অস্থিরতার জন্য আল্লাহর কাছে শিফা প্রার্থনা করা।
রুকইয়াহর শাব্দিক অর্থ
রুকইয়াহ মানে আশ্রয় গ্রহণ করা বা আশ্রয় প্রার্থনা করা।
পাঠ করা বা বলা
রুকইয়াহ অর্থ পাঠ করা অথবা বলা।
আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ
আল্লাহর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করাই প্রকৃত রুকইয়াহর উদ্দেশ্য।
রুকইয়াহর প্রকারভেদ
✅ রুকইয়াহ শারইয়াহ
- কুরআনের আয়াত
- সহীহ সুন্নাহ
- আল্লাহর নাম ও গুণাবলি
- তাওহীদের ভিত্তিতে
- আরবি + বাংলা বৈধ দোয়া
❌ রুকইয়াহ শিরকিয়্যাহ
- রোগী, পিতা, মাতার নাম জানতে চাওয়া
- জিনের সাহায্য নেওয়া
- শিরকি বাক্য
- অস্পষ্ট মন্ত্র
- হারাম
- তাবিজ এ কুফরি লেখা
রুকইয়াহর ইতিহাস
ইসলামের আবির্ভাবের আগেও আরবে ঝাড়ফুঁকের প্রচলন ছিল। তবে তাতে অনেক শিরকি বিষয় ও কুসংস্কার মিশ্রিত ছিল। নবীজি (সা.) এসে শিরকি অংশগুলো বাদ দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করার পদ্ধতি শিখিয়ে দেন।
📜 হাদিসের দলিল:
আউফ ইবনে মালিক আশজাঈ (রা.) বলেন, "আমরা জাহেলী যুগে ঝাড়ফুঁক করতাম। আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! এ বিষয়ে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন: 'তোমরা তোমাদের ঝাড়ফুঁকের মন্ত্রগুলো আমার কাছে পেশ করো। যদি তাতে শিরক না থাকে তবে ঝাড়ফুঁক করাতে কোনো দোষ নেই'।" (সহিহ মুসলিম: ২২০৩)
📖 কুরআন থেকে দলিল:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে, কুরআন নিজেই একটি শেফা বা আরোগ্য।
সুরা বনী ইসরাঈল: ৮২—
"আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।"
সুরা ইউনুস: ৫৭—
"হে মানবজাতি! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসীহত এসেছে এবং অন্তরের রোগের শেফা এসেছে।"
🤝 হাদিস থেকে দলিল:
রুকইয়াহর ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা এটি। সাহাবীগণ এক গোত্রপ্রধানকে সুরা ফাতেহা পড়ে ফুঁ দিয়ে বিষমুক্ত করেছিলেন.
হাদিস: আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, "নবী (সা.)-এর একদল সাহাবী এক সফরে ছিলেন... সেই গোত্রের নেতাকে বিচ্ছু দংশন করেছিল। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) তার ওপর সুরা ফাতেহা পড়ে ফুঁ দিলেন এবং সে সুস্থ হয়ে গেল। রাসুল (সা.) এই শুনে হেসে দিলেন এবং বললেন: 'তুমি কীভাবে জানলে যে এটি (সুরা ফাতেহা) একটি রুকইয়াহ?'"
রেফারেন্স:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২২৭৬;
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০১।
ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) স্বয়ং নবীজিকে রুকইয়াহ করেছিলেন, যা থেকে রুকইয়াহর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব প্রমাণিত হয়।
হাদিস:
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, জিবরাঈল (আ.) নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, 'হে মুহাম্মদ! আপনি কি অসুস্থ?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ'। জিবরাঈল (আ.) বললেন:
"بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ"
(আল্লাহর নামে আপনাকে রুকইয়াহ করছি, যা আপনাকে কষ্ট দেয় তা থেকে, প্রত্যেক আত্মা বা হিংসুকের নজর থেকে। আল্লাহ আপনাকে আরোগ্য দান করুন।)
রেফারেন্স:
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৮৬।
জাহেলী যুগেও আরবে ঝাড়ফুঁক ছিল। রাসুল (সা.) সেগুলোকে যাচাই করে শিরকমুক্ত রুকইয়াহর অনুমতি দেন।
হাদিস:
আউফ ইবনে মালিক আশজাঈ (রা.) বলেন, আমরা জাহেলী যুগে ঝাড়ফুঁক করতাম। আমরা রাসুল (সা.)-কে বললাম, এ বিষয়ে আপনার মত কী? তিনি বললেন:
"তোমাদের রুকইয়াহগুলো আমার কাছে পেশ করো। ঝাড়ফুঁক করাতে কোনো দোষ নেই যদি তাতে শিরক না থাকে।"
রেফারেন্স:
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০৩।
বدنজর একটি সত্য বিষয় এবং এর জন্য রুকইয়াহ করার বিশেষ নির্দেশ রয়েছে।
হাদিস:
উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) তাঁর ঘরে একটি মেয়েকে দেখলেন যার চেহারায় কালচে দাগ ছিল। তিনি বললেন:
"তাকে রুকইয়াহ করো, কারণ তাকে নজর লেগেছে।"
রেফারেন্স:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭৩৯;
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯৭।
শরীরের কোনো স্থানে ব্যথার জন্য রাসুল (সা.) একটি বিশেষ পদ্ধতি শিখিয়েছেন।
হাদিস:
উসমান ইবনুল আস (রা.) রাসুল (সা.)-এর কাছে শরীরের ব্যথার অভিযোগ করলেন। রাসুল (সা.) তাকে বললেন:
"তোমার দেহের ব্যথার জায়গায় হাত রাখো এবং তিনবার বলো 'বিসমিল্লাহ' এবং সাতবার বলো— 'আউযু বি-ইযযাতিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু'।"
রেফারেন্স:
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০২।
রাসুল (সা.) জাদুর শিকার হলে আল্লাহ এই দুটি সুরা নাযিল করেন।
হাদিস:
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন,
"রাসুল (সা.) যখন অসুস্থ হতেন, তখন তিনি নিজের ওপর 'মুআব্বিযাতাইন' (সুরা ফালাক ও নাস) পড়ে ফুঁ দিতেন। যখন তাঁর অসুস্থতা বেড়ে গেল, তখন আমি সেগুলো পড়ে তাঁর ওপর ফুঁ দিতাম এবং বরকতের আশায় তাঁর হাত দিয়েই তাঁর শরীর মুছে দিতাম।"
রেফারেন্স:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫০১৭;
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯২।
রাসুল (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে শয়তান ও নজর থেকে বাঁচানোর জন্য দোয়া করতেন।
হাদিস:
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,
নবী (সা.) হাসান ও হুসাইনকে রক্ষার জন্য এই বলে দোয়া করতেন:
"উ’ইযুকুমা বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শায়তানিন ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন।"
তিনি বলতেন,
"তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.) ইসমাইল ও ইসহাককেও এভাবে পানাহ চাইতেন।"
রেফারেন্স:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৭১।
যেকোনো বিষাক্ত কামড়ের চিকিৎসায় রুকইয়াহ অত্যন্ত কার্যকর।
হাদিস:
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত,
"রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক বিষধর প্রাণীর দংশনের চিকিৎসায় রুকইয়াহ করার অনুমতি দিয়েছেন।"
রেফারেন্স:
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭৪১;
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯৫।
রাসুল (সা.) জিনের সমস্যা আক্রান্ত এক যুবককে সুস্থ করেছিলেন।
হাদিস:
ইয়ালা ইবনে মুররাহ (রা.) থেকে বর্ণিত,
এক মহিলা তার ছেলেকে নিয়ে এল যে পাগল ছিল। নবী (সা.) তার নাকের কাছে মুখ নিয়ে বললেন:
"উখরুজ আদুওয়াল্লাহ, আনা রাসুলুল্লাহ"
(বের হয়ে যা ওরে আল্লাহর শত্রু! আমি আল্লাহর রাসুল।)
এরপর ছেলেটি সুস্থ হয়ে গেল।
রেফারেন্স:
মুসনাদে আহমাদ (৪/১৭১), হাকেম (২/৬১৭)। ইমাম হাকেম ও দাহাবী একে সহিহ বলেছেন।
যদি কেউ রুকইয়াহর মাধ্যমে কারো উপকার করতে পারে, তবে তা করা উচিত।
হাদিস:
জাবির (রা.) বলেন,
রাসুল (সা.)-কে ঝাড়ফুঁক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন:
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের উপকার করতে সক্ষম, সে যেন তা করে।"
রেফারেন্স:
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২১৯৯।
✨ আবূ সাঈদ (রাযি.) হতে বর্ণিত
أَنَّ نَاسًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَتَوْا عَلَى حَىٍّ مِنْ أَحْيَاءِ الْعَرَبِ فَلَمْ يَقْرُوهُمْ فَبَيْنَمَا هُمْ كَذَلِكَ إِذْ لُدِغَ سَيِّدُ أُولَئِكَ فَقَالُوا هَلْ مَعَكُمْ مِنْ دَوَاءٍ أَوْ رَاقٍ فَقَالُوا إِنَّكُمْ لَمْ تَقْرُونَا وَلاَ نَفْعَلُ حَتَّى تَجْعَلُوا لَنَا جُعْلاً فَجَعَلُوا لَهُمْ قَطِيعًا مِنَ الشَّاءِ فَجَعَلَ يَقْرَأُ بِأُمِّ الْقُرْآنِ وَيَجْمَعُ بُزَاقَهُ وَيَتْفُلُ فَبَرَأَ فَأَتَوْا بِالشَّاءِ فَقَالُوا لاَ نَأْخُذُهُ حَتَّى نَسْأَلَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَسَأَلُوهُ فَضَحِكَ وَقَالَ " وَمَا أَدْرَاكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ خُذُوهَا وَاضْرِبُوا لِي بِسَهْمٍ " .
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একদল সাহাবী আরবদের কোন এক গোত্রের নিকট আসলেন। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকৃতি জানাল। ইতোমধ্যে সেই গোত্র প্রধান বিচ্ছু বা বিষাক্ত কিছু দ্বারা দংশিত হলো। তারা সাহাবীদের কাছে এসে বলল, আপনাদের কাছে কি কোন ওষুধ বা ঝাড়ফুঁককারী আছে? সাহাবীরা বললেন, তোমরা আমাদের মেহমানদারী করনি, তাই আমরা তোমাদের কোন সাহায্য করব না যতক্ষণ না তোমরা আমাদের জন্য কোন পারিশ্রমিক নির্ধারণ কর। অতঃপর তারা একপাল ছাগল পারিশ্রমিক দিতে রাজি হল। অতঃপর এক সাহাবী সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে ফুঁ দিতে শুরু করলেন এবং সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। তারা ছাগল নিয়ে আসলে সাহাবীরা বললেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস না করে এগুলো গ্রহণ করব না। তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি হেসে দিলেন এবং বললেন: তুমি কীভাবে জানলে যে এটি একটি রুকইয়াহ? ছাগলগুলো নিয়ে নাও এবং আমার জন্যও একটি অংশ রেখো।
