0.00৳
هِجَامَة
হিজামা পরিচিতি
ইসলামি চিকিৎসা বিজ্ঞান ও আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত একটি পবিত্র ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি
পরিচিতি
১. হিজামা পরিচিতি ও তিব্বে নববিতে এর গুরুত্ব
‘হিজামা’ শব্দটি আরবি ‘আল-হাজম’ (الحجم) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘চোষা’ বা ‘টেনে বের করা’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায়, শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ থেকে সামান্য পরিমাণ ত্বক ছিদ্র করে রক্ত চোষক যন্ত্রের (Cup) মাধ্যমে দূষিত বা টক্সিনযুক্ত রক্ত বের করে আনাকে হিজামা বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজামাকে সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা হিসেবে অভিহিত করেছেন। মিরাজের রাতে ফেরেশতাদের জামাত রাসুল (সা.)-কে হিজামা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হাদিস সংকলন
২. হিজামা সম্পর্কিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস (রেফারেন্সসহ)
১. শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা
“তোমরা যেসব পদ্ধতিতে চিকিৎসা করো, তার মধ্যে হিজামা করাই হলো সর্বোত্তম।” (সহিহ বুখারি: ৫৬৯৬, সহিহ মুসলিম: ১৫৭৭)
২. আরোগ্যের মাধ্যম
“তিনটি জিনিসের মধ্যে রোগমুক্তি রয়েছে: হিজামা করা, মধুর শরবত পান করা এবং আগুনের ছ্যাঁকা নেওয়া। তবে আমি আমার উম্মতকে আগুনের ছ্যাঁকা নিতে নিষেধ করছি।” (সহিহ বুখারি: ৫৬৮০)
৩. ফেরেশতাদের সুপারিশ
“আমি মিরাজের রাতে ফেরেশতাদের যে দলের পাশ দিয়েই গিয়েছি, তারা সবাই আমাকে বলেছে— হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার উম্মতকে হিজামা করার নির্দেশ দিন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৪৭৭, তিরমিজি: ২০৫৩)
৪. মাথার হিজামা
রাসুল (সা.) ইহরাম অবস্থায় এবং সাধারণ অবস্থায়ও মাথার মাঝখানে হিজামা করাতেন। (সহিহ বুখারি: ৫৬৯৮)
৫. বিষক্রিয়া নিরসনে
খায়বারের যুদ্ধে বিষ মিশ্রিত গোশত খাওয়ার পর রাসুল (সা.) তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে হিজামা করিয়েছিলেন। (আবু দাউদ: ৪৫১২)
৬. পিঠের হিজামা
রাসুল (সা.) পিঠের মাঝখানে এবং ঘাড়ের দুই পাশের রগে হিজামা করাতেন। (তিরমিজি: ২০৫১)
৭. সুনির্দিষ্ট তারিখ
“যে ব্যক্তি চান্দ্র মাসের ১৭, ১৯ ও ২১ তারিখে হিজামা করাবে, তা সমস্ত রোগের প্রতিষেধক হবে।” (আবু দাউদ: ৩৮৬১)
৮. ব্যথায় হিজামা
কেউ পায়ে ব্যথার অভিযোগ করলে রাসুল (সা.) তাকে হিজামা করার পরামর্শ দিতেন। (আবু দাউদ: ৩৮৫৮)
৯. পাগলামি ও কুষ্ঠ রোগ
“মাথার মাঝখানে হিজামা করা সাতটি রোগের প্রতিষেধক: পাগলামি, কুষ্ঠ, শ্বেতী, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, দাঁতের ব্যথা, মাথাব্যথা এবং চোখের অন্ধকার।” (তাবারানি)
১০. হিজামার বরকত
রাসুল (সা.) বলেছেন, “হিজামা করালে জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়।” (ইবনে মাজাহ: ৩৪৮৮)
পদ্ধতি
৩. হিজামা করার নিয়ম ও পদ্ধতি
হিজামা মূলত ৩টি ধাপে করা হয়
০১
সাকশন (Suction)
নির্দিষ্ট স্থানে কাপ বসিয়ে ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য করা হয়।
০২
ইনসিশন (Incision)
হালকা করে চামড়ায় ছোট আঁচড় বা ছিদ্র করা হয় (যা অত্যন্ত সূক্ষ্ম)।
০৩
ব্লাড লেটিং (Blood Letting)
পুনরায় কাপ বসিয়ে দূষিত রক্ত টেনে বের করা হয়।
সতর্কতা
৪. কখন হিজামা করা যাবে না (নিষেধাজ্ঞা)
শরীরের অবস্থা
অত্যন্ত দুর্বল বা রক্তশূন্যতা (Anemia) থাকলে।
রোগ
হিমোফিলিয়া (রক্ত জমাট না বাঁধার রোগ) থাকলে।
গর্ভাবস্থা
গর্ভবতী মহিলাদের পিঠের নিচের অংশে বা পেটে হিজামা করা নিষেধ।
পেসমেকার
হার্টে পেসমেকার লাগানো থাকলে বুকের কাছে হিজামা করা যাবে না।
খালি বা ভরা পেট
একদম ভরা পেটে বা অত্যন্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায় না করা ভালো।
অঙ্গ
সরাসরি হাড়ের জয়েন্ট বা ভাঙা হাড়ের ওপর করা যাবে না।
বিজ্ঞান ভিত্তিক
৫. ল্যাব টেস্ট ও বিজ্ঞানভিত্তিক ৩০টি উপকারিতা
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ল্যাবরেটরি গবেষণায় হিজামার যে সকল উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে
ডিটক্সিফিকেশন
রক্ত থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন ও মেটাবলিক বর্জ্য অপসারণ করে।
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি
সারা শরীরে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়।
ইউরিক এসিড হ্রাস
রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা কমিয়ে গিঁটে ব্যথা দূর করে।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করে।
ইমিউন সিস্টেম
শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) সক্রিয় করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
এন্টি-ইনফ্লেমেটরি
শরীরের ভেতরের প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া কমায়।
নাইট্রিক অক্সাইড বৃদ্ধি
রক্তনালী প্রসারিত করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
হরমোন ব্যালেন্স
এন্ডোক্রাইন সিস্টেমের কার্যকারিতা উন্নত করে।
পেশির টান
মাসল স্পাজম বা পেশির শক্ত ভাব দূর করে।
লিম্ফ্যাটিক ড্রেনেজ
লসিকা তন্ত্রের ময়লা পরিষ্কার করে।
মানসিক প্রশান্তি
কর্টিসল হরমোন কমিয়ে স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা কমায়।
মাথাব্যথা ও মাইগ্রেন
মস্তিষ্কের রক্তচাপ কমিয়ে মাইগ্রেন দূর করে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা
মৃত কোষ সরিয়ে ত্বকের সজীবতা ফেরায়।
কিডনির কার্যকারিতা
রক্ত ফিল্টারিং প্রক্রিয়ায় কিডনিকে সহায়তা করে।
লিভারের সুস্থতা
লিভারের এনজাইম ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
ব্লাড সুগার
টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি বাড়ায়।
স্মৃতিশক্তি
মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে মনোযোগ বৃদ্ধি করে।
নার্ভাস সিস্টেম
প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে।
অ্যালার্জি দূরীকরণ
রক্তের ইমিউনোগ্লোবিন নিয়ন্ত্রণে এনে অ্যালার্জি কমায়।
পুরানো ব্যথা
দীর্ঘদিনের পিঠ বা কোমরের ব্যথা (Chronic pain) উপশম করে।
হজম প্রক্রিয়া
পাকস্থলী ও অন্ত্রের রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে হজম শক্তি বাড়ায়।
ব্রণ বা একনে
ত্বকের গভীর থেকে ব্যাকটেরিয়া ও দূষিত রক্ত বের করে ব্রণ সারায়।
ফুসফুসের শক্তি
অ্যাজমা বা কাশির সমস্যা কমাতে ব্রঙ্কিয়াল রক্ত প্রবাহ ঠিক করে।
ভারী ধাতু অপসারণ
রক্ত থেকে সিসা বা পারদ সদৃশ ক্ষতিকর ধাতু বের করে দেয়।
এন্টি-এজিং
কোষের নবজীবন দান করে বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করে।
ঘুমের উন্নতি
অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া দূর করতে কার্যকর।
সায়াটিকা ব্যথা
পায়ের সায়াটিক নার্ভের চাপ কমায়।
উচ্চ রক্তচাপ
সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক ব্লাড প্রেশার কমাতে সহায়ক।
বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ
প্রজনন অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে ফার্টিলিটি উন্নত করে।
সাইনাস
সাইনাসের জমাট বাঁধা কফ ও রক্তচাপ মুক্ত করে।
চিকিৎসা তালিকা
৬. হিজামায় যে সকল রোগের চিকিৎসা করা হয় (বিস্তারিত তালিকা)
হিজামা প্রায় সব ধরনের দীর্ঘমেয়াদী রোগে কার্যকরী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
বাত ও হাড়ের রোগ
অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, গিঁটে বাত, পিঠ ও কোমরের ব্যথা।
নিউরোলজিক্যাল
মাইগ্রেন, প্যারালাইসিস (আংশিক), সাইনাস, ভার্টিগো (মাথা ঘোরা)।
ত্বকের রোগ
সোরিয়াসিস, একজিমা, দীর্ঘমেয়াদী ব্রণ, শ্বেতী।
মেটাবলিক
স্থূলতা (ওজন কমানো), থাইরয়েড সমস্যা, ফ্যাটি লিভার।
গাইনোকোলজিক্যাল
অনিয়মিত পিরিয়ড, PCOs, বন্ধ্যাত্ব।
মানসিক
ডিপ্রেশন, এনজাইটি, প্যানিক অ্যাটাক।
পরিপাকতন্ত্র
আইবিএস (IBS), কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিক আলসার।
