জিন ও ইনসান 

জিন ও ইনসান

জিনের অস্তিত্ব সত্য। মানুষ যেমন আল্লাহর মাখলুক, জিনও আল্লাহর মাখলুক। জিনও মানুষের মতো শরীরী, আত্মাধারী, জ্ঞানসম্পন্ন ও চেতনাশীল। মানুষের মাঝে যেমন নর-নারী আছে, জিনের মাঝেও নর-নারী আছে। একইভাবে মানুষের মাঝে যেমন বিবাহ-শাদির রীতি আছে, জিনের মাঝেও বিবাহ-শাদি হয়। মানুষের যেমন সন্তান হয়, জিনেরও হয়। মানুষ যেমন শরিয়তের বিধান

ইমামুল হারামাইন রহ. বলেছেন-

إجماع كافة العُلماء في عَصْرِ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ عَلَيَّ وُجُودِ الْجِنِّ وَالشَّيَاطِينِ জিন ও শয়তানের অস্তিত্বের ব্যাপারে সাহাবা ও তাবেয়ি-যুগের সকল আলেম একমত হয়েছেন।

-আকামুল মারজান, পৃষ্ঠা-১৯

জান্নাতের হুরদের বর্ণনায় আল্লাহ বলেন,

فين فصرتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِتُهُنَّ إِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانَّ ) [الرحمن: ٦٥) সেখানে থাকবে আনত-নয়না রমণী, যাদের সঙ্গে ইতিপূর্বে কোনো মানুষও সহবাস করেনি,

কোনো জিনও সহবাস করেনি। সুরা রহমান: ৫৫, আয়াত: ৫৬

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ) [الكهف: ٠٥]

তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে ইবলিস ও তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে?-সুরা কাহফ

: ১৮, আয়াত: ৫০

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, আলেমগণ এসব আয়াত দিয়ে জিনদের বিবাহ-

শাদির পক্ষে দলিল পেশ করেন। -ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৫

* আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ) [الكهف: ٠٥]

তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে ইবলিস ও তার সন্তানদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে; অথচ তারা

তোমাদের শত্রু? সুরা কাহফ ১৮, আয়াত: ৫০ জিনের সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,

وَيُقَالُ : لَمْ يُفْصَل عَنِ الْجِنِّي الْأَوَّلِ أُنثَيْ كَمَا فُصِلَتْ حَوَاءُ بَلْ خُلِقَ لَهُ فَرَجٌ فِي نَفْسِهِ فَنَكَحَ

بعْضُهُ بَعْضًا فَأَتَى بِذكْرَانِ وَإِنَاتٍ ثُمَّ نَكَحَ بَعْضُهَا بَعْضًا.

প্রথম জিন থেকে কোনো মহিলা জিনকে সৃষ্টি করা হয়নি, যেমন (আদম আ. থেকে) হাওয়া আ.-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। বরং প্রথম জিনের মাঝেই বাচ্চাদানি সৃষ্টি করা হয়েছে।

এরপর সে পালনে আদিষ্ট, জিনও শরিয়তের বিধান পালনে আদিষ্ট। জিন ও ইনসান উভয়কে আল্লাহ তায়ালা তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেছেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ (الذاريات

আমি জিন ও ইনসানকে কেবল আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।

নিজেই নিজেকে বিবাহ করেছে এবং তা থেকে নর ও নারী জন্মগ্রহণ করেছে। এরপর তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাহ করেছে। -মুনাবি রহ.-এর ফয়যুল কাদির ৩: ৪৫০

সুরা জারিয়াত: ৫১, আয়াত: ৫৬।

জিন শরিয়তের বিধান পালনে আদিষ্ট

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতে, ইনসান যেমন ف بالشرعধর্ম। তথা শরিয়তের বিধি-বিধান পালনে আদিষ্ট, জিনও আদিষ্ট। শুধু ভ্রান্ত ‘হাশবিয়া’ ফিরকাই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছে। তাদের মতে ‘জিন আদিষ্ট নয়, কোনো কাজ করা না-করার ক্ষেত্রে জিনের কোনো স্বাধীনতা নেই। বরং তারা যা করে, তা অপারগ হয়েই করে।’ অথচ ইনসানের মতো জিনও শরিয়তের বিধি-বিধান পালনে আদিষ্ট হওয়ার ভরপুর দলিল রয়েছে। যেমন, কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

ا يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنكُمْ يَقْصُونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي وَيُنذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ) হে জিন ও মানবজাতি, তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য হতে এমন রাসুল আসেনি, যারা তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শোনাত এবং তোমাদেরকে এ দিনের (কিয়ামতের দিন)

সম্মুখীন হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করতো? -সুরা আনআম: ৬, আয়াত: ১৩০

قَالَ ادْخُلُوا فِي أُمَمٍ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ مِنَ الْجِن و الانس في النار . ) [الأعراف)

আল্লাহ বলবেন, তোমাদের পূর্বে জিন ও মানুষদের যেসব দল অতিবাহিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে

তোমরাও জাহান্নামে প্রবেশ করো। -সুরা আরাফ: ৭, আয়াত: ৩৮

ا وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ)

আমি জিন ও মানুষের মধ্য হতে বহুজনকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি।

-সুরা আরাফ: ৭, আয়াত: ১৭৯

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ) [الذاريات)

আমি জিন ও মানুষকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।

-সুরা যারিয়াত: ৫১, আয়াত: ৫৬

بمَعْشَرَ الْجِنِّ وَالإِنسِ إِن اسْتَطَعْتُمْ أن تنفذوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَوتِ وَ الْأَرْضِ فَانفُذُوا . لا

হে জিন ও মানবজাতি, তোমাদের যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সীমানা অতিক্রম করার

تَنفُذُونَ إِلَّا يسلطن (۳۳) فبأي آلاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّين (۴۳) (الرحمن)

সামর্থ্য থাকে, তবে তা অতিক্রম করো। তোমরা প্রচণ্ড শক্তি ছাড়া তা অতিক্রম করতে পারবে না। (৩৩) (অথচ সে শক্তি তোমাদের নেই) তাহলে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন

নিয়ামতকে অস্বীকার করবে? (৩৪) সুরা রহমান ৫৫

এসব আয়াত প্রমাণ করে যে, ইনসান যেমন শরিয়তের বিধান পালনে আদিষ্ট, জিনও আদিষ্ট।

কারণ এসব আয়াতে আল্লাহ তায়ালা-

১. জিন ও ইনসানকে একই সঙ্গে ‘সম্বোধন’ করেছেন।

২. তাদের হেদায়েতের জন্য রাসুল প্রেরণের কথা উল্লেখ করেছেন। 

৩. রাসুলগণ তাদের কাছে দীনের দাওয়াত দেওয়া ও তাদেরকে আখেরাতের ব্যাপারে সতর্ক করার কথা উল্লেখ করেছেন।

৪. অবাধ্য ও অবিশ্বাসীদের পরিণাম হিসাবে জাহান্নামের কথা উল্লেখ করেছেন।

৫. জিন ও ইনসানকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করার কথা স্পষ্টই বলেছেন।

জিনরা যদি শরিয়তের বিধান পালনে আদিষ্টই না হবে তাহলে তাদের জন্য কেন এতো আয়োজন, কেন তাদের হেদায়েতের জন্য রাসুল প্রেরণ, সতর্কবার্তা, আবার অবাধ্যতায় জাহান্নামের শাস্তি? রাসুলরাই-বা কেন জিনদেরকে ঈমান ও হেদায়েতের দাওয়াত দিবে, জাহান্নামের ভয় দেখাবে? যেমন আল্লাহ বলেছেন,

و إذ صرفنا إِلَيْكَ نَفَرًا مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ ، فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنْصِتُوا ، فَلَمَّا قُضِيَ وَلَوْا إِلَى قَوْمِهِمْ مُنْذِرِينَ (۲۹) قَالُوا يَقَوْمَنَا إِنَّا سَمِعْنَا كِتبًا أُنزِلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ يَهدى إلى الحق و إلى طريق مُسْتَقِيمٍ (۳۰) يقومنا أجيبوا دَاعِيَ اللَّهِ وَ آمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُمْ مِّنْ ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرَكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ (۳۱) وَ مَنْ لا يُحِبُّ دَاعِيَ اللَّهِ فَلَيْسَ بِمُعْجِزِ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاء – أولئك في صللٍ مُّبِينٍ (۳۲) [الأحقاف)

এবং (হে রাসুল, আপনি স্মরণ করুন,) যখন আমি একদল জিনকে কুরআন শোনার জন্য আপনার অভিমুখী করে দিয়েছিলাম। যখন তারা সেখানে পৌঁছল, (একে অন্যকে বলল) চুপ করো। যখন তা পড়া হয়ে গেল, তারা আপন সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে। (২৯) তারা বলল, হে আমাদের কওম, নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমরা এমন কিতাব (-এর তিলাওয়াত) শুনেছি, যা মুসার পরে অবতীর্ণ হয়েছে, তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থকরূপে, যা পথনির্দেশ করে সত্য ও সরল পথের। (৩০) হে আমাদের কওম, আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দাও ও তার প্রতি ঈমান আনো। আল্লাহ তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তোমাদের রক্ষা করবেন এক যন্ত্রণাময় শান্তি থেকে। (৩১) যে ব্যক্তি আল্লাহর আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিবে না, সে পৃথিবীর কোথাও গিয়ে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া সে কোনো রকমের অভিভাবকও পাবে না। এরূপ লোক সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। (৩২) সুরা আহকাফ: ৪৬

অবাধ্য ও অন্যায়কারী জিনদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,

) وَ أَمَّا الْقَسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا ) (الجن)

আর (জিনদের থেকে) যারা অন্যায়কারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন। সুরা জিন: ৭২, আয়াত: ১৫

এসব আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম,

১. রাসুল সা. ইনসান ও জিন উভয় জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। এ কারণে কুরআন শোনার জন্য জিনদের একটি দলকে আল্লাহ রাসুল সা.-এর অভিমুখী করেছিলেন।

২. জিনদের এই দল ফিরে গিয়ে তাদের কওমকে দীন, ঈমান ও হেদায়েতের দাওয়াত দিয়েছিল এবং এই খোশ খবর দিয়েছিল যে, ‘যারা ঈমান আনবে, আল্লাহ তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবেন’।

৩.ওই জিনরা তাদের মধ্যকার অবাধ্য ও অন্যায়কারীদেরকে বলেছিল, তাদের জন্য কোনো অভিভাবক নেই। পরের আয়াতে বলা হয়েছে, তারা হলো জাহান্নামের ইন্ধন।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, জিনরা রাসুল সা.-এর ডাকে সাড়া দেওয়া ও ঈমান আনার ‘মুকাল্লাফ’

এ কারণে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যেমন ভালোমন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন, জিনকেও দিয়েছেন। এরপর মানুষের মাঝে যেমন কেউ মুসলিম হয়েছে, আবার কেউ কাফের হয়েছে; অনুরূপ জিনের মাঝেও কেউ মুসলিম হয়েছে, কেউ কাফের হয়েছে। মানুষের মাঝে যেমন গোত্র ও সম্প্রদায়ের বিভক্তি আছে, অনুরূপ বিভক্তি জিনের মাঝেও রয়েছে। মানুষের মাঝে যেমন মুসলিম-কাফের, শিয়া-সুন্নি, কাদিয়ানি প্রভৃতির দ্বন্দ্ব রয়েছে, জিনের মাঝেও রয়েছে। এককথায় মানুষের মতো জিনদের মাঝেও আহলে কুরআন, আহলে হাদিস, আহলে বিদআত সবই রয়েছে।’ রাসুল সা. মানুষের জন্য যেমন প্রেরিত  হয়েছেন,  জিনদের জন্য ও প্রেরিত হয়েছেন। 

তথা নির্দেশপ্রাপ্ত। আহলে হকের মাঝে এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।

তবে ‘তাওহিদ ও আরকানে ইসলামে’-এর মুকাল্লাফ হওয়ার ক্ষেত্রে জিন ও ইনসানের মাঝে পার্থক্য না থাকার অর্থ এই নয় যে, শরিয়তের শাখাগত মাসআলা-মাসায়েলেও জিন ও ইনসানের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। মানব নারী ও পুরুষ উভয়ে ‘মুকাল্লাফ’ হওয়া সত্ত্বেও যেমন তাদের মাঝে শরয়ি বিধি-বিধানে পার্থক্য রয়েছে, অনুরূপ জিন ও ইনসান উভয়ে ‘মুকাল্লাফ’ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাঝে শরয়ি বিধি-বিধানে পার্থক্য রয়েছে। যেমন ‘গোবর’ তথা প্রাণীর মল মানুষের জন্য হারাম, অথচ তা জিনদের জন্য হালাল। আবু হুরাইরা রা. বলেছেন, রাসুল সা. আমাকে নির্দেশ দিলেন,

ابْعَنِي أَحْجَارًا أَسْتَنْفِضُ بِهَا، وَلَا تَأْتِنِي بِعَظْمٍ وَلَا بِرَوْنَةٍ فَأَتَيْتُهُ بِأَحْجَارٍ أَحْمِلُهَا فِي طَرَفِ ثَوْبِي، حَتَّى وَضَعْتُهَا إِلَى جَنْبِهِ، ثُمَّ انْصَرَفْتُ حَتَّى إِذَا فَرَغَ مَشَيْتُ، فَقُلْتُ: مَا بَالُ العَظمِ وَالرَّوْتَةِ؟ قَالَ: هُمَا مِنْ طعَامِ الجِنِّ، وَإِنَّهُ أَتَانِي وَقَدُ جِنّ نَصِيبِينَ، وَنِعْمَ الجِنُّ، فَسَأَلُونِي الزَّادَ، فَدَعَوْتُ اللَّهَ لَهُمْ أَنْ لَا يَمُرُّوا بِعَظْمٍ، وَلَا بِرَوْثَةٍ إِلَّا وَجَدُوا عَلَيْهَا طَعَامًا»

‘আমার জন্য পাথর নিয়ে এসো, যা দিয়ে ইসতিনজা করব। তবে হাড্ডি বা পাথর নিয়ে এসো না’। এরপর আমি আমার কাপড়ের কোনায় করে পাথর নিয়ে এলাম এবং রাসুল সা.-এর পাশে রাখলাম। এরপর ফিরে গেলাম এবং রাসুল সা. যখন ইসতিনজা থেকে ফারেগ হলেন, ফিরে এলাম। তখন আমি জানতে চাইলাম, হাড্ডি ও গোবরে কী সমস্যা? রাসুল সা. বললেন, এ দুটো জিনদের খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত। আমার কাছে নাসিবিনের জিনরা তারা কতই-না ভালো জিন- এসে খাদ্যের দরখাস্ত করল। তখন আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম, তারা যখনই কোনো হাড্ডি বা গোবরের কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে, তাতে তাদের খাদ্য পাবে।

-সহিহ বুখারি: ৩৮৬০

এ থেকে বোঝা যায়, জিন ও ইনসানের উপর আরোপিত বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে ব্যবধান রয়েছে এবং তারা তা অবশ্যই রাসুল সা. থেকে জেনে নিয়েছে। কারণ একাধিক রাতে রাসুল সা. তাদেরকে বিশেষভাবে তালিম দিয়েছেন, যা ‘লাইতুল জিন’ নামে পরিচিত।

বিস্তারিত জানতে পড়ুন: আকামুল মারজান পৃ: ৬২, ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৪, উমদাতুল কারি ১৫: ১৮৪, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ের শরহুল হামাভীসহ ৩: ৪০৬।

১ জিনের সম্প্রদায়-বিভক্তি

জিনরা মুসলিম, অমুসলিম, ইহুদি, নাসারা, শিয়া, কাদিয়ানিসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত। এর প্রমাণ কুরআনেই রয়েছে। কুরআনে জিনদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে এইভাবে,

,

أوْ أَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُوْنَ وَ مِنَّا الْقَسِطُوْنَ ، فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا (١٤) وَأَمَّا الْقَسِطُوْنَ فَكَانُوا

لِجَهَنَّمَ خَطَبًا (۱۵))

আমাদের কিছুসংখ্যক আজ্ঞাবহ এবং কিছু সংখ্যক অন্যায়কারী। যারা আজ্ঞাবহ, তারা সৎপথ বেছে নিয়েছে। (১৪) আর যারা অন্যায়কারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন। (১৫)

-সুরা জিন: ৭২

و أنا منا الصَّلِحُونَ وَ مِنا دُونَ ذلك . كُنَّا طرائق قدَدًا ( (الجن)

আমাদের কেউ সৎকর্মপরায়ণ এবং কেউ এরূপ নয়। আমরা ছিলাম বিভিন্ন ধর্মে বিভক্ত।

-সুরা জিন: ৭২, আয়াত: ১১

ইবনে আব্বাস ও মুজাহিদ রা. প্রমুখ জিনদের উপরিউক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেছেন,

) كُنَّا طَرَائِقَ فِدَدًا ( أَي مِنَّا الْمُؤْمِنُ وَمِنَّا الْكَافِرُ. আমাদের মাঝে মুমিনও রয়েছে, কাফেরও রয়েছে। -তাফসিরে ইবনে কাসির ৮: ২৪২

ইমাম বদরুদ্দীন আইনি রহ. বলেছেন,

ا و أنا مِنَّا الصَّلِحُونَ وَ مِنَّا دُونَ ذلك ، كُنَّا طَرائِق فِدَدًا ( أي مذاهب شتى مسلمون و يهود وكان من نصيبين يهوداً. وقال الإمام أحمد في كتاب الناسخ والمنسوخ ) : حدثنا مطلب بن زياد عن السدي، قال: في الجن قدرية ومرجلة وشيعة، وحكى السدي أيضا عن أشياخه أن في الجن المؤمن والكافر والمعتزلة والجهمية وجميع الفرق.

জিনদের বক্তব্য : ) 15کُلا طرائق فذ( এর অর্থ হলো- আমরা ছিলাম মুসলিম ইহুদি বিভিন্ন ধর্মে বিভক্ত। আর নাসিবিনের জিনরা ছিল ইহুদি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ, ‘আন্নাসেখ ওয়াল মানসুখ’ কিতাবে স্বীয় সনদে সুদ্দি রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘জিনের ভেতর কাদরিয়া, মুরজিয়া ও শিয়া রয়েছে।’ সুদ্দি রহ. তার শায়েখদের থেকে আরো বর্ণনা করেছেন, জিনের

মাঝে মুমিন, কাফের, মুতাযিলা, জাহমিয়া এবং সব ফেরকার লোকই রয়েছে।

-উমদাতুল কারি ১৫: ১৮৫

আল্লামা আহমাদ ইবনে সুলাইমান নাজাদ রহ. স্বীয় সনদে বর্ণনা করেছেন,

وَقَالَ أَحْمَدُ بْنُ سُلَيْمَانَ النَّجَادُ في أَمَالِيهِ، حَدَّثَنَا أَسْلَمُ بن سَهْلِ بَحْشَلُ، حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْحَسَنِ بْنِ سُلَيْمَانَ هُوَ أَبُو الشَّعْثَاءِ الْحَضْرَمِيُّ، شَيْخ مُسْلِمٍ حَدثنا أبو معاوية قال: سمعت الأَعْمَشِ يَقُولُ: تَرَوْحَ إِلَيْنَا جِنِي، فَقُلْتُ لَهُ: مَا أَحَبُّ الطَّعَامِ إِلَيْكُمْ؟ فَقَالَ الْأَرْزُ، قَالَ: فَأَتَيْنَاهُمْ بِهِ. فَجَعَلْتُ أَرَى اللَّهم تَرْفَعُ وَلَا أَرَى أَحَدًا، فَقُلْتُ: فِيكُمْ مِنْ هَذِهِ الْأَمْوَاءِ الَّتِي فِينَا ۚ قَالَ: نَعَمْ. قُلْتُ: فَمَا الرَّافِضَةُ فِيكُمْ ؟ قَالَ شَرنَا عَرَضْتُ هَذَا الْإِسْنَادَ عَلَى شَيْخِنَا الْحَافِظِ أَبِي الْحَجَّاجِ

المزي فقال: هذا إِسْنَادٌ صَحِيحٌ إِلَى الْأَعْمَشِ.

ইমাম আমাশ রহ. বলেন, এক জিন আমাদের কাছে এলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম-‘তোমার প্রিয় খাদ্য কী?’ বলল, ‘ভাত’। তখন আমরা তার জন্য ভাত নিয়ে এলাম। এরপর আমি লক্ষ করে দেখলাম, ‘ভাতের লোকমা ওঠানো হয়, কিন্তু আমি কাউকেই দেখলাম না’। আমি তাকে বললাম, ‘তোমাদের মাঝেও কি আমাদের মতো বিভিন্ন সম্প্রদায় আছে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ’। আমি বললাম, ‘শিয়াদেরকে তোমরা কেমন মনে করো?’ সে বলল, ‘তারা আমাদের মাঝে নিকৃষ্ট’। হাফেয আবুল হাজ্জাজ মি্যি রহ. বলেছেন, ইমাম আমাশ পর্যন্ত এই সনদ বিশুদ্ধ। -তাফসিরে ইবনে কাসির ৮: ২৪২, আকামুল মারজান, পৃষ্ঠা: ১০৯

তায়েফবাসীদের ঈমান আনয়নের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে মক্কা-অভিমুখে ফেরার পথে রাসুল সা. ‘নাখলা’ নামক স্থানে অবস্থান করেন এবং শেষরাতে তাহাজ্জুদ নামায আদায় করেন। তখন ইয়ামেনের ‘নাসিবিন’ শহরের জিনদের একটি প্রতিনিধি দল -যারা মেঘমালা পর্যন্ত পৌছে উর্ধ্বজগতের খবর সংগ্রহ করতে না পারার কারণ অনুসন্ধানে বের হয়েছিল- রাসুল সা.-এর তিলাওয়াত শ্রবণ করেছিল। বলা হয়ে থাকে, ‘নাসিবিনে’র এই জিনরা ছিল ইহুদি সম্পদ্রায়ের।

এ কারণে তারা স্বগোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে মুসা আ.-এর কথা উল্লেখ করে বলেছিল-

ا يقومنا إنا سمعنا كتبا أنزل من بَعْدِ مُؤسَى ) [الأحقاف)

হে আমাদের কওম। আমরা এমন কিতাব শ্রবণ করেছি, যা মুসা আ.-এর পরে অবতীর্ণ হয়েছে।

-সুরা আহকাফ: ৪৬, আয়াত: ৩০

বিস্তারিত দেখুন- ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর ফাতহুল বারি ৮ ৬৭৪, দারুল মারিফাহ। ইমাম বদরুদ্দীন আইনি রহ.-এর উমদাতুল কারি ১৫ ১৮৬-৭, দারু এহইয়াউত তুরাস, বৈরুত।

সারমর্ম হলো, ‘জিনের মাঝে ভালো-খারাপ দু-দলই রয়েছে’। তবে ভালো জিন সাধারণত লোকালয়ে আসে না। লোকালয়ে আসে বদজিন, কুরআনে যাদেরকে শয়তান বলা হয়েছে। এরা আসে মানুষের দীন-ঈমান চুরি করার জন্য। এরা মিথ্যায় ওস্তাদ, প্রতারণায় পটু। এদের কথা বিশ্বাস করা যাবে না এবং এদের পরামর্শ গ্রহণ করা যাবে না। আলোচনা কিঞ্চিৎ লম্বা করে পাঠককে এই ধারণা দেওয়াই উদ্দেশ্য যে, লোকালয়ে আসা জিনদের মাঝে আহলে কুরআন, ফিতনাবাজ কথিত আহলে হাদিস, শিয়া, কাদিয়ানি থেকে নিয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি, নাসারা, মাজুসি সবই রয়েছে। এদের ভেল্কি বহুমুখী। কখনো সরাসরি মন্দের দাওয়াত দেয়, আবার কখনো ভালোর সুরতে মন্দের প্রতি ধাবিত করার চেষ্টা করে। সুতরাং আমরা যেন কখনোই এদের কোনো কথা-পরামর্শ সাদা দিলে গ্রহণ না করি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

১ রাসুল সা. জিন-ইনসান উভয়ের প্রতি প্রেরিত

জিনরা মানুষের মতোই শরিয়তের মুকাল্লাফ। মানুষের মতো শরিয়তের বিধিবিধান পালনে তারাও আদিষ্ট। আল্লাহর আদেশ সাধারণের কাছে পৌঁছে নবী-রাসুলগণের মাধ্যমে। তাহলে জিনদের কাছে আল্লাহর আদেশ কীভাবে পৌঁছত? মানব নবী-রাসুলদের মাধ্যমে, না তাদের মাঝেই নবী-রাসুল প্রেরিত হতো? এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো বর্ণনা নেই। জুমহুর তথা উম্মাহর অধিকাংশ বিদ্বান মনে করেন, মানব নবী-রাসুলই তাদের নবী-রাসুল। তাদের জন্য স্বতন্ত্র কোনো নবী বা রাসুল প্রেরিত হয়নি। আবার কেউ কেউ তাদের প্রতি স্বতন্ত্র নবী-রাসুল প্রেরিত হওয়ারও দাবি করেছেন। তাই বিষয়টি কিছুটা বিতর্কিত। তবে এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, আখেরি নবী মুহাম্মদ সা. ছিলেন জিন-ইনসান সকলের নবী, নবীয়্যুস সাকালাইন। উভয় জাতির প্রতিই তিনি প্রেরিত হয়েছেন। তার পরে কোনো নবী আসবে না। মানুষের থেকেও না, জিনদের থেকেও না। দুনিয়ার বুকে তার শরিয়তই আখেরি শরিয়ত। আইনি রহ. বলেন,

هَلْ كَانَ فِيهِمْ نَبِي مِنْهُمْ أو لا ؟ فروى الطبري من طريق الصحاكِ بْنِ مُزَاحِمْ، إِثْبَاتَ ذَلِكَ. وَجُمْهُورُ الْعُلَمَاءِ سَلْفًا وَخَلْفاً عَلَى أَنَّهُ لَمْ يَكُنْ مِنَ الْجِنِّ نَبِي قَط وَلَا رَسُولٌ، وَلَمْ تَكُنِ الرُّسُلُ

إلا مِنَ الْإِنْسِ، وَنُقِلَ هَذَا عَنِ ابْنِ عَبَّاسِ وَابْنِ جُرَيْجٍ وَمُجَاهِدٍ وَالكَلبِي وَأَبِي عُبَيْدٍ وَالْوَاحِدِي. জিনদের মাঝে কি কোনো নবী ছিল? ইমাম তাবারি রহ. যাহহাক ইবনে মুযাহিম রহ. থেকে ‘হ্যাঁ-বোধক’ বর্ণনা করেছেন। তবে পূর্বাপরের অধিকাংশ বিদ্বান মনে করেন, তাদের মাঝে কোনো নবীও ছিল না, রাসুলও ছিল না। এ কথা ইবনে আব্বাস, ইবনে জুরাইজ, মুজাহিদ, কালবি, আবু উবাইদ, ওয়াহেদি রা. প্রমুখ থেকে বর্ণিত রয়েছে। -উমদাতুল কারি ১৫: ১৮৪-৫ ইমাম ইবনে আবদুল বার রহ. বলেন,

وَقَالَ ابْن عَبْدِ الْبَرِّ لَا يَخْتَلِفُونَ أَنَّهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بُعِثَ إِلَى الْإِنْسِ وَالْجِنِّ. 

হিসাব হবে জিনেরও হবে তাদের জন্য শাস্তি বা প্রতিদান এবং জান্নাত বা জাহান্নাম রয়েছে। 

তবে এ সব দিক থেকে মিল থাকলেও জিন ও ইনসানের মাঝে অনেক বড় পার্থক্যও রয়েছে। মানুষের সৃষ্টির মূল উপাদান মাটি, আর জিন সৃষ্টির মূল উপাদান আগুন।’ এ কারণে কপালপোড়া ইবলিস আদম আ.-কে সিজদা না করার ভ্রান্ত যুক্তি উপস্থাপন করে বলেছিল,

{قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَّارٍ وَ خَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ} [ص]

আমি তার থেকে উত্তম। আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন দিয়ে, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে।২

জিনের মাঝে মানুষের তুলনায় দুষ্টবৃত্তি অনেক বেশি। তাফসিরে মাযহারীতে আছে : ‘কুরআনে যাদেরকে শয়তান বলা হয়েছে, বাহ্যত তা জিনের দুষ্টশ্রেণির নাম’। 

এ ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই যে, রাসুল সা. জিন-ইনসান উভয় জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছেন। -ইবনে হাজার আসকালানি রহ., ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৫

ইমামুল হারামাইন রহ, ‘আল-ইরশাদ’ গ্রন্থে বলেন,

وَقَالَ إِمَامُ الْحَرَمين في الإرشاد في أثناء الكلام مع العيسوية وقد عَلِمْنَا ضرُورَةً أَنَّهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ادَّعَى كُونَهُ مَبْعُونا إلى الثقلين وقال بن تيمية اتفق على ذلك علماء السلف مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ وَأَئِمَّةِ المُسْلِمِينَ

‘আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, রাসুল সা. নিজেকে জিন ও ইনসানের প্রতি প্রেরিত বলে দাবি করেছেন। ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন ‘সাহাবা ও তাবেয়ি যুগের আলেম ও মুসলমানদের ইমামগণ এ ব্যাপারে একমত। ইবনে হাজার আসকালানি রহ., ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৫ ১

জিনরাও জান্নাত বা জাহান্নামে যাবে

আখেরাতে জিনদের কী পরিণতি হবে? আলেমগণ একমত যে, আখেরাতে কাফের ও দুষ্কৃতিকারী জিনদের শাস্তি হবে। আর মুমিন ও সৎকর্মশীল জিনদের ব্যাপারে একদল ওলামা নীরব থেকেছেন, যেহেতু কুরআন-হাদিসে বিষয়টি স্পষ্ট বিবৃত হয়নি। অন্যরা বিভিন্ন দলিলের ইঙ্গিত থেকে নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তবে জুমহুর তথা উম্মাহর অধিকাংশ বিদ্বান মনে করেন, মানুষের মতো জিনরাও আখেরাতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আবুশ শাইখ রহ. স্বীয় ‘তাফসিরে’ তাবেয়ি মুগিস ইবনে সুমাই রহ. থেকে বর্ণনা করেন,

وَرَوَى أَبُو الشَّيْخِ فِي تَفْسِيرِهِ عَنْ مُغِيثِ بْنِ سُعَيَ أَحَدِ التَّابِعِينَ قَالَ مَا مِنْ شَيْءٍ إِلَّا وَهُوَ يَسْمَعُ زَفِيرَ جَهَنَّمَ إِلَّا النَّقَلَيْنِ الَّذِينَ عَلَيْهِمُ الْحِسَابُ وَالْعِقَابُ জিন ও ইনসান ব্যতীত সবকিছুই জাহান্নামের আওয়াজ শুনতে পায়, আখেরাতে যাদের উপর

হিসাব-আযাব রয়েছে। ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৬

আল্লামা আইনি রহ. বলেন,

واتفق العلماء على أن كافر الجن يعذب في الْآخِرَة القَوْله تَعَالَى: ( النَّارُ مَثْوَبِكُمْ ) (الْأَنْعَامِ : (۸۲۱) . واختلفوا في مؤمني الجنّ، هَل يدخلون الجنة ؟ على أَرْبَعَة أَقْوَالَ: وَالْجُمهور على أنهم يدخلُونَهَا، حَكَاهُ ابن حزم في (الملل) عن ابن أبي ليلى، وأبي يُوسُفَ وَجُمهور النَّاسِ.

আলেমগণ একমত যে, কাফের জিনদেরকে আখেরাতে শাস্তি দেওয়া হবে। কেননা আল্লাহ (জিনদের উদ্দেশ্য করে) বলেছেন ‘জাহান্নাম তোমাদের ঠিকানা’ (সুরা আনআম: ৬, আয়াত : ১২৮)। তবে তারা মতভেদ করেছেন মুমিন জিনদের ক্ষেত্রে। মুমিন জিনরা কি জান্নাতে প্রবেশ করবে, এ প্রশ্নের জবাবে চারটি মত রয়েছে। জুমহুরের মত হলো, হ্যাঁ, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইমাম ইবনে হাযম রহ. ‘আল-মিলাল’ গ্রন্থে ইবনে আবু লাইলা, আবু ইউসুফ ও অধিকাংশ মনীষী থেকে এ কথা বর্ণনা করেছেন। উমদাতুল কারি ১৫: ১৮৪

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ. উল্লেখ করেছেন-

لَمْ يَخْتَلِفْ مَنْ أَثْبَتَ تَكْلِيفَهُمْ أَنَّهُمْ يُعَاقَبُونَ عَلَى الْمَعَاصِي . وَذَهَبَ الْجُمْهُورُ إِلَى أَنَّهُمْ يُتَابُونَ عَلَى الطَّاعَةِ وَهُوَ قَوْلُ الْأَئِمَّةِ الثَّلَاثَةِ وَالْأَوْزَاعِي وَأَبِي يُوسُفَ وَمُحَمَّدِ بْنِ الْحَسَنِ وَغَيْرِهِمْ . وَنُقِلَ عَنْ مَالِكٍ أَنَّهُ اسْتَدَلْ عَلَى أَنَّ عَلَيْهِمُ الْعِقَابَ وَلَهُمُ الثَّوَابَ بِقَوْلِهِ تَعَالَى وَ لِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَنِ ثُمَّ قَالَ فبأي آلاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبْنِ وَالْخِطَابُ لِلْإِنْسِ وَالْجِنِّ فَإِذَا ثَبَتَ أَنَّ فِيهِمْ مُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنُ مِنْ شَأْنِهِ أَنْ

يَخَافَ مَقَامَ رَبِّهِ ثَبَتَ الْمَطْلُوبُ وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

যারা জিনকেও মুকাল্লাফ তথা শরিয়তের বিধান পালনে আদিষ্ট বলে মনে করেন, তারা একমত যে, জিনরা অপকর্মের শান্তি পাবে। … জুমহুর উম্মত মনে করেন, তাদেরকে আনুগত্যের উপর প্রতিদান দেওয়া হবে। এটা ইমাম মালেক, শাফেয়ি, আহমাদ, আওযায়ি, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ শাইবানি প্রমুখের অভিমত।… ইমাম মালেক রহ, জিনদের জন্য শাস্তি ও সাওয়াব থাকার পক্ষে এই আয়াত দ্বারা দলিল পেশ করেন। আল্লাহ বলেছেন ‘যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য দুটি জান্নাত’। আল্লাহ তায়ালা এর পর বলেছেন ‘তোমরা দু’জন আল্লাহর কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?’। এখানে ‘তোমরা’ বলতে জিন-ইনসান উভয়কে বোঝানো হয়েছে। আর এ কথা প্রমাণিত যে, জিনদের মাঝে মুমিনও রয়েছে এবং এটাই স্বাভাবিক যে, মুমিন আল্লাহকে ভয় করবে। সুতরাং আমাদের দাবি প্রমাণিত হলো। -আসকালানি রহ.-এর ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৫-৬

জিন সৃষ্টির মূল উপাদান আগুন

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

( وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ مِّنْ حَمَةٍ مَّسْنُونٍ ﴿۲۶﴾ وَالْجَانَّ خَلَقْنَهُ مِنْ قَبْلُ مِنْ نَّارِ السَّمُومِ (۲۷))

আমি মানুষকে পচা কাদা থেকে তৈরি শুষ্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি। (২৬) আর জিনকে এর আগে লু-এর আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছি। (২৭) সুরা হিজর ১৫, আয়াত: ২৬ ও ২৭

{ وَ خَلَقَ الْجَانُ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ } [الرحمن)

তিনি জিনকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নিশিখা থেকে। -সুরা রহমান: ৫৫, আয়াত: ১৫

আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, রাসুল সা. বলেছেন,

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خُلِقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورِ، وَخُلِقَ الْجَانُ مِنْ مارج مِنْ نَارٍ، وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ»

ফেরেশতাদেরকে ‘নুর’ থেকে এবং জিনকে ‘অগ্নিশিখা’ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ওই উপাদান থেকে, যা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে।

-সহিহ মুসলিম: ২৯৯৬

২. সুরা স-দ: ৩৮, আয়াত: ৭৬; সুরা আরাফ: ৭, আয়াত: ১২।

* মুফতি শফি রহ.-এর মাআরিফুল কুরআন (সংক্ষপ্তি), পৃষ্ঠা- ১৪০৯। বিস্তারিত আসছে।

জিন শব্দের ধাতুগত অর্থ হলো গোপন, গুপ্ত। জিন মানুষকে দেখতে পায়, কিন্তু মানুষ জিনকে তার আসল আকৃতিতে দেখতে পায় না। জিন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারে, মানুষ পারে না। দুষ্ট জিন হলো নেককার ইনসানের জাতশত্রু, প্রকাশ্য দুশমন। আল্লাহ বলেছেন,

ا يَبَنِي آدَمَ لَا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَنُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِّنَ الْجَنَّةِ يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْاتِهِمَا ، إِنَّهُ يَرَبَكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ ، إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيْطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ لَا يُؤْمِنُوْنَ )

হে বনি আদম, শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে, যেমন তোমাদের (আদি) পিতা-মাতা (আদম ও হাওয়া)-কে পোশাক ছিনিয়ে নিয়ে জান্নাত থেকে বের করেছে, যাতে তাদেরকে লজ্জাস্থান দেখিয়ে দেয়। সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখো না। আমি শয়তানকে অবিশ্বাসীদের বন্ধু বানিয়েছি।২

সুতরাং শয়তানের কারণেই আদম ও হাওয়া আ.-কে জান্নাত থেকে বের হতে হয়েছিল এবং তাদের থেকে জান্নাতের পোশাক খসে পড়েছিল। বনি আদমের

১. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ, উল্লেখ করেছেন,

روَى الْبَيْبَقِي فِي مَنَاقِبِ الشَّافِعِي بِإِسْنَادِهِ عَنِ الرَّبِيعِ سَمِعْتُ الشَّافِعِيُّ يَقُولُ مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ يَرَى الْجِنَّ أَبْطَلْنَا شَهَادَتَهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ نَبِهَا انْتَهَى وَهَذَا مَحْمُولٌ عَلَى مَنْ يَدَّعِي رُؤْيَتَهُمْ عَلَى صُوَرِهِمُ الَّتِي خُلِقُوا عَلَيْهَا وَأَمَّا مَنِ ادَّعَى أَنَّهُ يَرَى شَيْئًا مِنْهُمْ بَعْدَ أَنْ يَتَطَوَّرَ عَلَى صُوَرٍ شَتَّى مِنَ الْحَيَوَانِ فَلَا يَقْدَحُ فِيهِ وَقَدْ

تَوَارَدَتِ الْأَخْبَارُ بِتَطَوُّرِهِمْ فِي الصُّورِ

ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, ‘নবী ব্যতীত কেউ যদি জিন দেখার দাবি করে, আমরা তার শাহাদাত প্রত্যাখ্যান করব।’ এর অর্থ হলো ‘কেউ যদি জিনকে তার সৃষ্টিগত আকৃতিতে দেখার দাবি করে। তবে কেউ যদি অন্য প্রাণী বা বস্তুর আকৃতিতে জিনকে দেখার দাবি করে, তাতে সমস্যা নেই। জিনের বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারা সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে।

-ফাতহুল বারি ৬: ৩৪৪

২. সুরা আরাফ: ৭, আয়াত: ২৭।

পোশাক, আদমের বিরুদ্ধে শয়তানের প্রথম টার্গেট

জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর শয়তান আদম আ.-এর বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করে, কীভাবে তাকেও জান্নাত থেকে বের করা যায়। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে সে আদম ও হাওয়া আ.-এর শরীর থেকে জান্নাতের পোশাক খুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

فَوَسْوَسَ لَهُمَا الشَّيْطَنُ لِيُبْدِي لَهُمَا مَاوَرى عَنْهُمَا مِنْ سَوْاتِهِمَا وَقَالَ مَا تَكُمَا رَبُّكُمَا عَنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ إلا أن تكونا ملكين أو تكونا مِنَ الْخَلِدِينَ (۲۰) وَقَاسَمَهُمَا إِلى لَكُمَا مِنَ النَّصِحِينَ (۲۱) فَدَلَهُمَا بغُرُورٍ ، فَلَمَّا ذاقا الشَّجَرَةَ بَدَتْ لَهُمَا سَوانُهُمَا وَطَفِقَا يَخْصِفَنِ عَلَيْهِمَا مِنْ وَرَقِ الْجَنَّةِ وَنَادَهُمَا رَبُّهُمَا

أَلَمْ أَنْهَكُمَا عَنْ تِلْكُمَا الشَّجَرَةِ و أقل لكما إن الشَّيْطَنَ لَكُمَا عَدُوٌّ مُّبِينٌ (۲۲)) [الأعراف) এরপর শয়তান তাদেরকে ওয়াসওয়াসা দিলো, যাতে সে তাদের আবৃত লজ্জাস্থান খুলে দিতে পারে। আর বলল, তোমাদের রব তোমাদেরকে কেবল এ কারণেই এ গাছ থেকে খেতে নিষেধ করেছেন, পাছে তোমরা ফেরেশতা কিংবা চিরস্থায়ী জীবনের অধিকারী হয়ে যাও (২০) আর শয়তান তাদের দু’জনকে কসম খেয়ে আশ্বস্ত করল, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের

কল্যাণকামী। (২১) এভাবে শয়তান প্রতারণাপূর্বক তাদেরকে সম্মত করে ফেলল। এরপর যখন তারা (নিষিদ্ধ) গাছ আস্বাদন করল, তাদের লজ্জাস্থান খুলে গেল এবং তারা নিজেদের উপর জান্নাতের পাতা জড়াতে লাগল। আর তাদের রব তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে ওই গাছ থেকে নিষেধ করিনি? আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন?

(২২) সূরা আরাফ: ৭, আয়াত: ২০-২২

উপরিউক্ত আয়াত থেকে বন্ধুতার সুরতে শয়তানের চরম শত্রুতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সে কত বড় ধূর্ত, কসম খেয়ে মিথ্যা বলে মানুষকে প্রতারিত করে। জানা যায় যে, আদম ও হাওয়া আ.-কে জান্নাত থেকে বের করার জন্য শয়তানের প্রথম লক্ষ্য ছিল, তাদেরকে বস্ত্রহীন করা। আরো জানা যায় যে, লজ্জাস্থান আবৃত রাখা মানুষের স্বভাবজাত। এ কারণেই শয়তানের চক্রান্তে আদম ও হাওয়া আ.-এর পোশাক খসে পড়ার পর তারা সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান আবৃত করতে শুরু করেছিলেন।

সুতরাং মানুষকে বিপথগামী করার জন্য শয়তানের প্রথম লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, শয়তান আমাদের প্রকাশ্য দুশমন। তার শত্রুতা আজও অব্যাহত। আজও শয়তান ও তার চেলারা মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য কথিত সভ্যতা ও আধুনিকতার নামে সর্বপ্রথম উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ করে দেয়। এরপর নানা প্রলোভন ও মুখরোচক শ্লোগানের মাধ্যমে কুপথে পরিচালিত করে। শয়তানের তথাকথিত প্রগতি নারীকে লজ্জা-শরম থেকে বঞ্চিত করে উলঙ্গ বা অর্ধ-উলঙ্গ করা ব্যতীত অর্জিতই হয় না। পরিতাপ হলো, প্রবৃত্তি পূজারি একশ্রেণির মানুষ কথিত সভ্যতা, প্রগতি ও আধুনিকতার নামে শয়তানের দেখানো পথে নিজেকে জলাঞ্জলি দিতেই ভালোবাসে। সমাজে এর বিরূপ প্রভাব প্রকটভাবে ফুটে ওঠা সত্ত্বেও তারা হুঁশে আসতে চায় না। অথচ সতর-আবৃতকারী পোশাক মানুষের উপর ঈমানের পরে সর্বপ্রথম ফরয। নামায, রোযা ইত্যাদি সবই সতর ঢাকার পরে। উলঙ্গপনা শুধু চূড়ান্ত হীনতা ও নির্লজ্জতার লক্ষণই নয়, বরং এটা নানা প্রকার অনিষ্টের দ্বার উন্মুক্ত করে। উলঙ্গপনার দরজা দিয়ে মুসলিম সমাজে কত অনাচারের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং শয়তানের কত কুমতলব পুরা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। এ কারণেই শয়তানের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হলো মানুষের পোশাক।

সুতরাং যারা শয়তানের খপ্পর থেকে বাঁচতে চায়, তাদেরকে স্বীয় পোশাকের প্রতি যত্নবান হতে হবে এবং কুরআনে ‘কল্যাণ’ বলে আখ্যায়িত ‘লিবাসুত তাকওয়া’ (তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতার লিবাস) অবলম্বন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ينى آدَمَ قَد أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوَاتِكُمْ وَرِيْشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ، ذَلِكَ مِنْ آيَتِ اللهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ (۲۶) يبنى آدَمَ لا يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَن كما أخرج أبونَكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ يَنْزِعُ عَنْهُمَا لِمَا سَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْاتِهِمَا ، إِنَّهُ يُرَبِّكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لا تَرَوْنَهُمْ إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيْطِينَ أَوْلِيَاءَ لِلَّذِينَ

لا يُؤْمِنُونَ (۲۷)) [الأعراف] হে আদমসন্তান, আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, যা আবৃত করে তোমাদের দেহের প্রকাশ-দোষণীয় অঙ্গগুলোকে। এ পোশাক তোমাদের জন্য সৌন্দর্যেরও উপকরণ। তাকওয়ার লিবাসই হলো সর্বোত্তম। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্তর্ভুক্ত। এসবের ব্যবস্থা এজন্য যে, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে। (২৬) হে আদমসন্তান, শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিতনার শিকার করতে না পারে, যেমন তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছে। শয়তান তাদের শরীরের অপ্রকাশযোগ্য স্থান প্রকাশ করে দেওয়ার জন্য তাদের পোশাক কেড়ে নিয়েছিল। শয়তান ও তার দল তোমাদেরকে এমন স্থান থেকে দেখে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। আমি শয়তানকে বেঈমানদের বন্ধু বানিয়ে দিয়েছি।

(২৭)-আরাফ: ৭, আয়াত: ২৬ ও ২৭

এ আয়াত থেকে জানা যায়, সমাজে ফিতনামুক্ত থাকার পেছনে পোশাকের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই শয়তান মানুষকে পূর্ণ বা আংশিক পোশাকমুক্ত করে ফিতনার শিকার করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ সাবধান করেছেন, শয়তান যেন সে সুযোগ না পায়। তা সত্ত্বেও কিছু মানুষের কানে এ বার্তা পৌঁছায় না, শয়তানের কুমন্ত্রণা তাদের কানকে বধির করে রেখেছে।

উপরিউক্ত আয়াত থেকে আরো জানা যায়, পোশাকের উদ্দেশ্য দুটি সতর আবৃত করা ও সৌন্দর্য। খোদ পোশাকই সৌন্দর্য এবং পোশাক পরিধান করলে মানুষকে সুন্দর লাগেই। কিন্তু শুধু সৌন্দর্যের জন্য পোশাক নয়। যারা শুধু সৌন্দর্যের জন্য পোশাক পরিধান করে, অপ্রকাশযোগ্য অঙ্গ আবৃত করার প্রতি যত্নবান হয় না, হাদিসে তাদেরকে ‘উলঙ্গ পরিধানকারী’ বলা হয়েছে (সহিহ মুসলিম: ২১২৮)। তারা আল্লাহপ্রদত্ত ‘নিয়ামতে লিবাসে’র অপব্যবহার করেছে। এসব লোকেরাই সাধারণত শয়তানের ফিতনায় নিপতিত হয়, আর এরপর ‘হায় হায়’ করে।

লিবাসে তাকওয়া ওটাই, যা একই সঙ্গে সতর আবৃত করে এবং মানুষকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। এ পোশাকই রাসুল সা. এবং তার থেকে শিখে পুরুষ ও মহিলা সাহাবিগণ পরিধান করেছেন।

আমাদের সালাফ ও সালেহিন এমন পোশাকই পরিধান করে থাকেন।

যদি এমন হয়, কেউ পোশাক পরিধান করল, আর বেছে বেছে শরীরের কিছু অঙ্গ অনাবৃত বা প্রায় অনাবৃত রাখল, কিংবা শরীরের ভাঁজগুলোকে কাপড়ের উপর দিয়ে মানুষকে দেখাল। তাহলে পরিণাম-বিবেচনায় বলা যায়, সে পোশাক পরিধান না-করাই ভালো। এর দ্বারা ফিতনার আশঙ্কা আরো বেড়ে যায়। কারণ পোশাক মানুষকে সুন্দর করে এবং খোদ পোশাকেরই একটি সৌন্দর্য ও আকর্ষণ আছে। এই আকর্ষণ ওই ‘উলঙ্গ পরিধানকারী’র প্রতি মানুষকে তাকাতে ও আকৃষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণে কথিত আধুনিকতা ও প্রগতির ধ্বজাধারীরা এমন পোশাকই পরিধান করে এবং বিভিন্ন কৌশলে অন্যদেরকেও প্ররোচিত করে।

পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুসলিম-স্বকীয়তা বজায় রাখাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘আহাদিসে ফিতরাতে’ রাসুল সা. বিজাতিদের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য বলেছেন। অন্য হাদিসে বলেছেন, ‘যে যাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের দলভুক্ত’। তাই যেসব পোশাকে মুসলমানিত্ব

ফুটে ওঠে না, তা বর্জন করাই বাঞ্ছনীয়। আমাদের দেশে বর্তমানে প্যান্ট, শার্ট, টাই ইত্যাদির সয়লাব। অথচ এসব আমাদের পোশাক নয়। স্বকীয়তার অভাব আর অবাধ বিজাতি-প্রীতির প্রবণতা থেকেই এসব আমাদের সমাজে প্রবেশ করেছে। কারো কারো ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আমাদের আকাবির-আসলাফ এমনকি সাহাবা-তাবেয়িন, বরং প্রিয় রাসুল সা.-এর পোশাক ভালো না লাগারও কারণ হতে শুরু করেছে। অভিভাবক নিজেও ‘লিবাসে সালেহিন’ পরিধান করেন না, সন্তানদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেন না। কোনো কোনো অভিভাবক তো বরং না পরার জন্যই উৎসাহ দেন। হায় বাবা তুমি তো মোল্লা-মৌলবি হয়ে গেছ। এতো তাড়াতাড়িই দাড়ি-টুপি-জুব্বায় নিজেকে আচ্ছাদিত করে ফেললে কী অবস্থা হবে! অনেক কথিত সচেতন অভিভাবকের মুখে এমন আক্ষেপের কথাও শোনা যায়।

কেউ কেউ আবার স্ত্রী কিংবা সমাজের দোহাই দেন। অথচ স্ত্রী বা সমাজ তার পরকালের জিম্মাদার নয়। আমার পাথেয় আমাকেই সঞ্চয় করতে হবে। ‘লিবাসে তাকওয়া’ তাকওয়ার পথে চলা সহজ করে দেয়, বরং উৎসাহিত করে এবং ফিসক ও ফুজুর থেকে দূরে রাখে; এ কথা কে অস্বীকার করতে পারবে? মাথায় টুপি, গায়ে জুব্বা, মুখে দাড়ি নিয়ে সিনেমা হলে যেতে সংকোচ লাগবেই।

পরকালীন সফলতার পথ অনেক সহজ। তবে আমরাই কঠিন করে ফেলছি।