জিনের বিবাহ-শাদি ও সন্তানধারণ

জিনের বিবাহ-শাদি ও সন্তানধারণ

জিনের বিবাহ-শাদি ও সন্তানধারণ

সকল আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, জিনেরা পরস্পরে বিবাহ করে থাকে। তাদেরও সন্তান-সন্ততি ও ছেলে-মেয়ে জন্ম নেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

১ জিন কীভাবে আকৃতি পরিবর্তন করে

আল্লামা আইনি রহ. উল্লেখ করেছেন,

وَقَالَ السُّهَيْلِيَّ : الْجِنُّ ثَلَاثَةُ أَصْنَافٍ ، كَمَا جَاءَ فِي حَدِيْثِ: صِنْفٌ عَلَى صُوَرِ الْحَيَّاتِ، وَصِنْفٌ عَلَى صُورَةِ كِلَابٍ سُودٍ، وَصِنْفٌ رِيحٌ طَيَّارَةٌ. أَوْ قَالَ : هَفَّافَةٌ ذُوْ أَجْنِحَةٍ ، وَهُمْ يَتَصَوَّرُونَ فِي صُوَرِ الْحَيَّاتِ وَالْعَقَارِبِ، وَفِي صُوَرِ الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ وَالْغَنَمِ وَالْخَيْلِ وَالْبِغَالِ وَالْحَمِيرِ، وَفِي صُوَرِ الطَّيْرِ، وَفِي صُوَرِ بَنِي أَدَمْ. وَقَالَ القَاضِي أَبُو يَعْلَى : وَلَا قُدْرَةَ لِلشَّيَاطِينِ عَلَى تَغْبِيْرِ خَلْقِهِمْ وَالِانْتِقَالِ فِي الصُّوَرِ، وَإِنَّمَا يَجُوزُ أَنْ يُعَلِّمَهُمُ اللهُ كَلِمَاتٍ وَضَرْبًا مِنْ ضُرُوبِ الْأَفْعَالِ ، إِذَا فَعَلَهُ وَتَكَلَّمَ بِهِ نَقَلَهُ مِنْ صُورَةٍ إِلَى صُورٍ أُخْرَى. وَأَمَّا أَنْ يُصَوِّرَ نَفْسَهُ فَذَاكَ مُحَالٌ.

সুহাইলি রহ. বলেছেন, জিন তিন প্রকার, যেমনটা হাদিসে এসেছে। এক প্রকার সাপের আকৃতিতে, একপ্রকার কালো কুকুরের আকৃতিতে, আরেক প্রকার পাখাবিশিষ্ট ও বাতাসের মাঝে দ্রুত চলমান। তারা সাপ, বিচ্ছু, উট, গরু, ছাগল, ঘোড়া, খচ্চর, গাধা, পাখি ও মানুষ প্রভিতির আকৃতি ধারণ করতে পারে।

কাজি আবু ইয়ালা রহ. বলেছেন, নিজের ক্ষমতা-বলে আকৃতি পরিবর্তন ও অন্য আকৃতি ধারণ করা শয়তানের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে হতে পারে, আল্লাহ তাদেরকে কিছু কথা বা কৌশল শিখিয়ে দিয়েছেন, যা প্রয়োগ করলে তারা ভিন্ন আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়। নিজে নিজে আকৃতি পরিবর্তন করা, এটা অসম্ভব। -উমদাতুল কারি ১৫: ১৮৩

সম্ভবত এখানে তিন প্রকার বলতে তিন অবস্থার কথা বলা হয়েছে, যে তিন অবস্থায় থাকতে জিনরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। যেকোনো জিনই আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে, এটাই প্রসিদ্ধ। জিনের পরিচয়ও তো এভাবে দেওয়া হয় যে, ‘সূক্ষ্ম দেহবিশিষ্ট প্রাণী, যা এক আকৃতি থেকে অন্য আকৃতিতে রূপান্তরিত হতে পারে’।

বলা হয়ে থাকে, আকৃতি পরিবর্তন করা জিনের জন্য সাংঘাতিক কষ্টকর। এক আকৃতি থেকে অন্য আকৃতিতে যেতে জিনকে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু তারপরেও জিন এটা করে, যার বড় মাকসাদ মানুষকে ভয় দেখানো… 

افَتَتَّخِذُونَهُ وَ ذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِي وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ} [الكهف: ٥.] তোমরা কি আমার পরিবর্তে তাকে (ইবলিস) ও তার সন্তানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করছ; অথচ তারা তোমাদের দুশমন?

এ আয়াত থেকে পরিষ্কার জানা গেল যে, জিন বংশবৃদ্ধির জন্য পরস্পরে বিবাহ- শাদি করে থাকে। আল্লাহ বেহেশতের হুরদের প্রশংসায় বলেছেন,

{ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ اِنْسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌ } [الرحمن: ٦٥]

ইতিপূর্বে তাদের সঙ্গে না কোনো মানুষ সহবাস করেছে, না কোনো

জিন।২

এ আয়াত থেকে বোঝা গেল, ইনসান বা মানুষের মতো আল্লাহ তায়ালা জিনদের মধ্যেও কামভাব বা বিপরীতলিঙ্গের প্রতি যৌন-আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন।

এইজন্য জিনেরা পরস্পরে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাদেরও সন্তান হয়।

ইনসানের সঙ্গে জিনের দৈহিক সম্পর্ক

জিন ও ইনসানের মাঝে দৈহিক মিলন হতে পারে। আমাদের সমাজেও এর বাস্তবতা রয়েছে। এমন হলে মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে, পুরুষ হোক বা নারী। জিন তখন স্বামীকে স্ত্রী থেকে এবং স্ত্রীকে স্বামী থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ফলে তারা একে অপরের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে। যেমন কিছুদিন আগে এক ব্যক্তি আমাকে বলেন, হুজুর, আমার যুবতি স্ত্রী ইদানীং আমাকে একদম সহ্য করতে পারে না। মারধরও করে। আবার

বলে, তুই এই মহিলার সঙ্গে কী চাস? এ তো আমার স্ত্রী, একে তো আমি তোরও আগে বিবাহ করেছি। এই মহিলার কাছে এলে তোর খবর আছে। ইত্যাদি।

বিস্তারিত বিবরণ শুনে আমার মনে হলো, মেয়েটার সঙ্গে হয়তো জিন বিবাহের আগেই দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। অভিভাবকরা তা বুঝতে পারেননি। মেয়ের উদাসীনতা দেখে তারা হয়তো ধারণা করেছেন বিবাহের পর সব ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু ফল হয়েছে উলটো।

ইনসানের সঙ্গে জিনের বিবাহ-

জিনের সঙ্গে মানুষের বিবাহের অনেক গল্প শোনা যায়। এসব বিবাহের কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই বিবাহ নাজায়েয এবং তারা যদি সহবাস করে, তা হারাম হবে। আল্লাহ মানুষের জন্য মানবসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন। এটা তার ইহসান ও কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ বলেন,

وَ مِنْ أَيْتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا} [الروم : ١٢]

আর তার কুদরতের একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গী সৃষ্টি করেছেন।১

এখানে আল্লাহ বলছেন, তিনি মানুষের জন্য মানুষের থেকে সঙ্গী তৈরি করেছেন; অথচ জিন মানুষ নয়, এ কথা বলাইবাহুল্য। আল্লামা মুহাম্মদ আমিন শানকিতি রহ. উল্লেখ করেছেন-

فِي الْفَتَاوَى السَّرَاجِيَّةِ لِلْحَنَفِيَّةِ: لَا تَجُوزُ الْمُنَاكَحَةُ بَيْنَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ وَإِنْسَانِ الْمَاءِ : لِاخْتِلَافِ الْجِنْسِ وَفِي فَتَاوَى الْبَارِزِي مِنَ الشَّافِعِيَّةِ: لَا يَجُوزُ التَّنَاكُحُ بَيْنَهُمَا.

হানাফিদের ‘ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়্যা’য় রয়েছে: জিন, ইনসান ও সমুদ্র-মানবের (মৎস্যকন্যা) মাঝে বিবাহ জায়েয নয়। কেননা তাদের জাত ভিন্ন। শাফেয়িদের ‘ফাতাওয়ায়ে বারেযি’তে রয়েছে : জিন ও ইনসানের মাঝে বিবাহ বৈধ নয়।২

তা ছাড়া জিন মিথ্যা ও হঠকারিতা-প্রবণ জাতি। তারা আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। এক জিন যদি মানুষের স্ত্রী হয়, অন্য জিন যদি স্ত্রীর আকৃতি ধারণ করে তার কাছে আসে, সে কীভাবে বুঝবে তার কাছে কে এসেছে; তার স্ত্রী, না অন্য জিন? স্বামী জিন হলেও একই কথা।

জিনের সঙ্গে সহবাস করে মানুষের গর্ভবতী হওয়ার কোনো ঘটনা সম্ভবত সহিহ সনদসূত্রে প্রমাণিত নেই। তবে বাস্তবে যদি জিনের সঙ্গে সহবাস করার দ্বারা মানুষ গর্ভবতী হয়, তাহলে মানব-সমাজে ওই সন্তানের নসব (পিতৃ ও বংশপরিচয়) কীভাবে প্রমাণিত হবে? মিরাস কীভাবে বণ্টন করা হবে? এর দ্বারা বরং সমাজে ফিতনার বিস্তার ঘটবে। সমাজে কোনো অবিবাহিত তরুণী গর্ভবতী হলে সে হয়তো দাবি করে বসবে, আমার স্বামী জিন। তাই শরিয়ত ও যুক্তি, কোনো দিক থেকেই জিন ও ইনসানের পারস্পরিক বিবাহ সমর্থনযোগ্য নয়।

রেফারেন্স 

১. সুরা কাহফ: ১৮, আয়াত: ৫০।

২ সুরা রহমান: ৫৫, আয়াত: ৫৬.