ইবলিসের পরিচয়

ইবলিসের পরিচয়

 

ইবলিসের পরিচয়

জিন, ইবলিস ও শয়তান কি একই, না ভিন্ন? এ সম্পর্কে এমন কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই, যা চূড়ান্ত জ্ঞান দান করে এবং যার পরে কোনো কথা থাকে না। তাই বিভিন্ন বর্ণনার আলোকে ইমামগণ তাদের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। ফলে সন্দেহ থেকেই যায়, কোন মতটি বাস্তবসম্মত? তবে আমাদেরকে এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়নি। তাই আমরা সেদিকে যাবো না। এখানে শুধু ইসলামি বিদ্বানগণের কিছু অভিমত উল্লেখ করব, যাতে পাঠক মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করতে পারেন। সংক্ষিপ্ত কথা হলো, জিন, ইবলিস ও শয়তান এক হোক বা ভিন্ন, আমরা বিশ্বাস করি, এদের অস্তিত্ব সত্য।

আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে আদমমুখী হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইবলিসও সেই নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ফেরেশতারা আল্লাহর ওই নির্দেশ পালন করলেও ইবলিস অস্বীকার করেছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَ إِذْ قُلْنَا لِلْمَلْئِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيْسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَ ذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِى وَهُمْ لَكُمْ عَدُوٌّ بِئْسَ لِلظَّلِمِينَ

بدلا} [الكهف) 

আমি যখন ফেরেশতাদের বললাম, ‘তোমরা আদম (অভিমুখী হয়ে) সিজদা করো’, তারা সিজদা করল। কিন্তু ইবলিস সিজদা করল না। সে ছিল জিনজাতির অন্তর্গত। এ কারণেই সে তার রবের নির্দেশ উপেক্ষা করেছে। তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে তাকে ও তার বংশধরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে; অথচ তারা তোমাদের শত্রু? জালেমদের প্রতিফল কতই-না নিকৃষ্ট!’

এ আয়াত থেকে আমরা অবগত হলাম:

১. ইবলিস বংশবিস্তারও করে এবং সে ও তার বংশধররা মানবজাতির শত্রু। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারা জালেম। আর জালেমের পরিণাম খুবই নিকৃষ্ট।

২. ইবলিস জিনজাতির অন্তর্গত। এ কারণেই সে অবাধ্যতা করেছে। কারণ জিনজাতি অবাধ্যতায় অভ্যন্ত। সে যদি ফেরেশতাদের অন্তর্গত হতো, তাহলে সে অবাধ্য হতো না। ফেরেশতাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

إِلَّا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُونَ} [التحريم)

তারা আল্লাহর আদেশের অবাধ্যতা করে না এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয়, তারা তা পালন করে।২

প্রশ্ন জাগে, সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি হওয়া সত্ত্বেও ইবলিসের অবস্থান কীভাবে ফেরেশতাদের মধ্যে হলো এবং কীভাবে সে ফেরেশতাদের দেওয়া নির্দেশের অন্তর্গত হলো? উত্তরে ইমাম কুরতুবি রহ. উল্লেখ করেছেন,

وَقَالَ شَهْرُ بْنُ حَوْشَبٍ وَبَعْضُ الْأُصُولِيِّينَ : كَانَ مِنَ الْجِنَّ الَّذِينَ كَانُوا فِي الْأَرْضِ وَقَاتَلَتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ فَسَبَوْهُ صَغِيرًا وَتَعَبَّدَ مَعَ الْمَلَائِكَةِ وَخُوطِبَ وَحَكَاهُ الطَّبَرِيُّ عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ.

শাহর ইবনে হাওশাব ও কোনো কোনো উসুলবিদ ইমাম বলেছেন : ‘ইবলিস জমিনে অবস্থানকারী জিনদের সদস্য ছিল। তাদের সঙ্গে ফেরেশতারা লড়াই করেছেন এবং ইবলিসকে ছোট অবস্থায় গ্রেফতার করেছেন। তখন থেকে সে ফেরেশতাদের সঙ্গে ইবাদত করেছে এবং ফেরেশতাদের প্রতি কৃত খেতাবের (সম্বোধন) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ইমাম তাবারি রহ. এ কথা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন।

রেফারেন্স– 

সুরা কাহফ: ১৮, আয়াত: ৫০।

সুরা তাহরিম: ৬৬, আয়াত: ৬।

তাফসিরে কুরতুবি ১: ২৯৪।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. উল্লেখ করেছেন-

عن بن عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ اسْمُ إِبْلِيسَ حَيْثُ كَانَ مَعَ الْمَلَائِكَةِ عَزَازِيلٌ ثُمَّ إِبْلِيسُ بَعْدُ.

ইবনে আব্বাস রা. থেকে ইমাম তাবারি ও ইবনে আবুদ্দুনইয়া রহ. বর্ণনা করেছেন, ইবলিস যখন ফেরেশতাদের সঙ্গে ছিল তখন তার নাম ছিল আযাযিল। পরে (অহংকারের পরিণামে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে) ‘ইবলিস’ নামকরণ করা হয়েছে।’

মোটকথা, ইবলিসও জিন। জিন আগুনের সৃষ্টি, ইবলিসও আগুনের সৃষ্টি। তবে সে ছোটবেলায় ফেরেশতাদের হাতে গ্রেফতার হয়ে ফেরেশতাদের মাঝে বেড়ে উঠেছে এবং সম্বোধনের ক্ষেত্রে সে ফেরেশতাদের মাঝেই গণ্য হয়েছে। কিন্তু ‘কুকুরের পেটে ঘি সয় না’, তাই সেই সম্মান তার কপালে স্থায়ী হয়নি। অহংকার তাকে সর্বনিকৃষ্ট অভিশপ্তে পরিণত করেছে।

জিন ও শয়তান

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন,

وَإِذَا ثَبَتَ وُجُودُهُمْ فَقَدِ اخْتُلِفَ فِي أَصْلِهِمْ فَقِيلَ إِنَّ أَصْلَهُمْ مِنْ وَلَدِ إِبْلِيسَ فَمَنْ كَانَ مِنْهُمْ كَافِرًا سُمِّيَ شَيْطَانًا وَقِيلَ إِنَّ الشَّيَاطِينَ خَاصَّةً أَوْلَادُ إِبْلِيسَ ومن عداهم ليسوا من ولده وحديث ابن عباس الآتِي فِي تَفْسِيرِ سُورَةِ الْجِنَ يُقَوِّي أَنَّهُمْ نَوْعٌ وَاحِدٌ مِنْ أَصْلٍ وَاحِدٍ وَاخْتَلَفَ صِنْفُهُ فَمَنْ كَانَ كَافِرًا سُمِّيَ شَيْطَانًا وَإِلَّا قِيلَ لَهُ جِنِّي

জিনের অস্তিত্ব প্রমাণিত। তবে মতভেদ হলো তাদের ‘মূল’ নিয়ে। কেউ বলেছেন ‘তারা ইবলিসের সন্তান। ইবলিসের সন্তানদের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে শয়তান বলা হয়।’ কেউ বলেছেন ‘শুধু শয়তানই ইবলিসের সন্তান। বাকিরা ইবলিসের সন্তান নয়।’ তবে ইবনে আব্বাস রা.-এর হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাদের ‘মূল’ একই। তবে তাদের মাঝে ভাগ রয়েছে। যারা কাফের, তাদের বলা হয় শয়তান। বাকিদের বলা হয় জিন।

ফাতহুল বারি – ৬- ৩৪৪